দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কথিত সীমানা পিলার ও প্রাচীন কয়েন ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিপুল মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মৌলভীবাজারে একটি প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- রাজনগর উপজেলার বাংলা টিলা (পণ্ডিত নগর) গ্রামের এস এম ইলিয়াছুর রহমান (৩৬), শ্রীমঙ্গল উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের মো. ইকরাম মিয়া (২৮), ঢাকার মোহাম্মদপুরের শ্যামলী এলাকার তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান (৬১) এবং মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকার মো. ইব্রাহিম বেপারী (৩৭)।
বুধবার (১ অক্টোবর) মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে ইলিয়াছুর রহমান ও ইকরাম মিয়াকে শ্রীমঙ্গল এলাকা থেকে এবং তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ও ইব্রাহিম বেপারীকে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।
এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত একটি কথিত ‘অ্যান্টিক পাওয়ার কয়েন’, যার মূল্য ২০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছিল, একটি নোহা গাড়ি, একটি পকেট রাউটার, আটটি মুঠোফোন, বিভিন্ন নামে ৫০০টি পরিচয়পত্র, ৯৪ পাতা ভুয়া ব্যবসায়িক চুক্তিপত্র, তিনটি চেকবই, একটি কয়েনের খালি অ্যালবাম, একটি ডায়েরি, ১০টি সিমকার্ড, ১০০ টাকা মূল্যমানের ছয়টি ভুয়া স্ট্যাম্প এবং ‘অ্যান্টিক গ্যালারি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর নামে একটি ভুয়া সনদ জব্দ করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, চক্রটি বিশ্বের বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসছিল। এর আগে ২০২৩ সালে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের হাতে একই ধরনের প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই চক্রের অন্যতম সদস্য তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামানসহ চারজন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার বালিসহস্র গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমের সঙ্গে প্রায় ছয় মাস আগে পরিচিতির সূত্রে কথিত মূল্যবান ধাতব বস্তু কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের পরিচয় হয়। তারা দাবি করেন, চাতলাপুর চা-বাগানের কয়েকজনের কাছে ব্রিটিশ আমলের একটি মূল্যবান ধাতব বস্তু রয়েছে, যার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান সেটি কিনতে আগ্রহী এবং মধ্যস্থতা করতে পারলে বিপুল অর্থ লাভ করা যাবে বলে তাকে প্রলোভন দেখানো হয়।
পরবর্তীতে কথিত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে তাহের-উল-ইসলাম আখতারুজ্জামান ভুক্তভোগীর আমেরিকাপ্রবাসী মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজেকে ‘ইউএস হেরিটেজ অকশন’-এর বাংলাদেশের পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, প্রতারণার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একজনকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট চাতলাপুর চা-বাগানে কথিত বিশেষজ্ঞ বস্তুটি পরীক্ষা করে সেটি মূল্যবান ও আসল বলে দাবি করেন। পরে বস্তুটি কেনার জন্য অর্থের প্রয়োজন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে টাকা নেওয়া শুরু হয়।
একপর্যায়ে এক কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলে ২৫ লাখ টাকা করে মোট চারটি স্বাক্ষরিত চেক নেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর কথিত মূল্যবান বস্তুটি হস্তান্তরের কথা বলে ভুক্তভোগী ও তার মামাতো ভাইকে চাতলাপুর চা-বাগানে নেওয়া হয়। সেখানে কথিত বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে বস্তুটি পরীক্ষা করে সঠিক বলে দাবি করা হয় এবং একটি বাক্সে করে সেটি তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় তাদের কাছ থেকে নগদ দুই কোটি টাকা নেওয়া হয়। পাশাপাশি আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে মোট সাড়ে তিন কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে বিশ্বাস সৃষ্টি করা হয়। দুই দিন পর আরও ১০ কোটি টাকা দিয়ে বস্তুটি নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে বাক্সটি তাদের হেফাজতে দেওয়া হয়।
পরে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর বাক্সটি খুলে ভুক্তভোগীরা দেখতে পান, সেখানে কোনো মূল্যবান ধাতব বস্তু নেই; বরং একটি সাপ রাখা রয়েছে। বিষয়টি জানালে চক্রের সদস্যরা নানা ধরনের কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। এমনকি টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে কথিত বস্তুটি ‘জিনের মাধ্যমে সাপে পরিণত হয়েছে’ এবং ২১ দিন পর সেটি আবার ফিরে আসবে বলেও দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে আরও একটি মূল্যবান বস্তু পাওয়ার কথা বলে ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। পূর্বের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ভুক্তভোগী আরও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু পরে টাকা বা কথিত মূল্যবান কোনো বস্তুই ফেরত পাননি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে মোট প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালে কুলাউড়া থানায় একটি মামলা করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভনে পড়ে অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
কেএম